হারাই বারেবার

আমাদের তিন ভাই বোনের বাবা ছিলো না, তাই মায়ের চাকরি করা ছাড়া উপায় ছিলো না। তার ওপর সেলাই ফোঁড়াই করে বাড়তি আয়। ফলে আমাদের তিন ভাই বোনের কপালে বাবা তো ছিলোই না, মাও ছিলো কম। সুমিদি ছিলো কিছুদিন, নানু ছিলো কিছুদিন। আর অনেক অনেক দিন আমি ছিলাম বাড়ির বড় ছেলে, আমার বয়স এখন পদ্মর বয়সের মতো। আদর নেবার বয়সে আদর দেবার দায়ীত্ব পেয়ে ব্যর্থ  হয়েছি লাগাতার। কিন্তু তখনই কিছু চাওয়ার আগ্রহ চলে গেছে। এখন পদ্মর কারণে বুঝি, আমার হয়তো আরেকটু ভালোবাসা দরকার ছিলো। তাই ভালোবাসার লোভ রয়ে গেলো সারাজীবন। কিন্তু শেষটায় দেখলাম সব সম্পর্কেই ভালোবাসার মধ্যে প্রচুর চাওয়া পাওয়ার হিসাব আছে। আমার বোঝা খুব ভুল। এর মধ্যে অনেক অ্যাকাউন্টিং, পুলিশ ব্যবস্থা ইত্যাদি কিসব।

কেবল পদ্মই আমাকে এমনিতেই ভালোবাসে। পদ্মর বাবাও পদ্মকে এমনিতেই ভালোবাসে। যেরকম একটা ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা চেপে রেখে, আশায় থেকে এতদিন পার করেছি, এটা সেই ভালোবাসা। পদ্মকে আমি বেশি বানিয়ে বলতে পারিনা, যখন বলি তখন বানানো হিসাবেই বলি। যতদূর ফিজিক্স-কেমিস্ট্রি বুঝি, চেষ্টা করি সহজে বলার। সবটা পারিও না। পদ্মর মা জিজ্ঞেস করলে চাপা মারতে পারি, বেশি ভালো পারিনা, পদ্মকে মোটেই পারিনা।

পদ্মকে বেশি নিষেধও করতে পারিনা। ও যা করে আমার মনে হয় ওর এইটাই করার কথা। একটাই ভয়, লোকে যদি পদ্মকে বকে, অবহেলা করে... পদ্মর মা দিনরাত মেয়ের সঙ্গে থাকে, সে জানে কতদূর কি করা যায়। আমি জানি না। আমি তো পদ্মর সাথে থাকি না। আমি পদ্মর সব পায়ের শব্দ শুনতে পাই, সব ডাকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ি। পদ্মও বাবাকে সুপারম্যান ভাবে বোধহয়, ২০ কেজি ওজনের মেয়ে আমার পেটের ওপর দুমদাম লাফ দিয়ে পড়ে। বাবা পদ্মর খেলনার ডাক্তার, বইয়ের মিস্ত্রি, কাঁধে চড়ার ঘোড়া, খেলার সাথী। যদিও বাবার পদ্মকে গোসল, কাপড় বদলানো ইত্যাদিতে সাহায্য করা নিষেধ। পদ্মর আমার কোলে বসাও নিষেধ। পদ্ম অবশ্য নিষেধ মানতে পারেনা। বাবার কোলেই বসে থাকার চেষ্টা করে। পায় তো না।